প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কোন পথে?

খলিলউল্লাহ্

০৬ জুলাই ২০১৭, ০১:০৫

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন–বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন বা ইউএনএফসিসিসি ১৯৯২ সালে প্রণীত হয়। ২৩ বছর ধরে অনেক সাধনার পর ২০১৫ সালে প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সারা বিশ্ব চুক্তিবদ্ধ হয়। এখন সেই দীর্ঘ সাধনার ফসল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণায় পণ্ড হতে বসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০টি বৃহৎ কোম্পানি, বিনিয়োগকারী, বিভিন্ন শহরের মেয়র, ট্রাম্পের নিজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পোপ, এমনকি ব্যাপক হারে কার্বন নির্গমনকারী তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোও এই চুক্তিতে থাকতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সব তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলেন।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ব্যাপারটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। গরিব দেশগুলোর খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা কম বলে তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলোও বিপদমুক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৬০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় তিন ফুট পর্যন্ত বাড়বে। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ ফ্লোরিডার ৯ লাখ ৩৪ হাজার মানুষের জানমাল ডুবে যাওয়ার ঝুঁকির মুখে আছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

তাহলে ট্রাম্পের ঘোষণার পর প্যারিস চুক্তির ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে? সহজভাবে বললে, কার্বন নির্গমন কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিবদ্ধ থাকতে হবে, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রদেশ ও শহর নিজেরাই স্বল্প-কার্বন নির্গমন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মুনাফা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা দেখে সেদিকে এগোচ্ছে। আশঙ্কার কথা হলো, অন্য দেশগুলোও নৈতিকভাবে এই চুক্তি সমর্থন না করলে কিছু আর করার থাকবে না। কিন্তু চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও ভারতের মতো বৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো প্যারিস চুক্তি মেনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা চালিয়ে যাবে বলে পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির আওতায় থাকলেও অনিচ্ছাসহকারে থাকত। এর ফলে অনেক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে প্যারিস চুক্তি আরও শক্তিশালী হবে। তাদের কথা হলো, ট্রাম্প সবুজ জলবায়ু তহবিলে অর্থ দিতেন না। অন্যদিকে ওবামার ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান এবং গাড়ি উৎপাদক কোম্পানিগুলোর ওপর পরিবেশদূষণ রোধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও তিনি তুলে নিয়েছেন। ফলে কার্বন নির্গমনের অভ্যন্তরীণ উৎসগুলো আবার সচল হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও প্যারিস চুক্তির লাভ হতো না। উল্টো প্যারিস চুক্তির ভবিষ্যৎ আলোচনায় ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা দিয়ে ঝামেলা তৈরি করত।

শিকাগো কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ জনগণ (৭১ শতাংশ) প্যারিস চুক্তিতে থাকার পক্ষে। বিশ্লেষকদের যুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও প্যারিস চুক্তির যেহেতু লাভ হতো না, তাই চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে তা জনগণের মধ্যে ট্রাম্পবিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। ফলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জনগণ নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে, যিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সম্প্রতি জি-৭ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশগুলো প্যারিস চুক্তি মেনে চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজারেও নিজের আধিপত্য বিস্তার করবে। এ ছাড়া তারা নিজেরাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ায় এই চুক্তির পক্ষেই থাকছে। শুধু যে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতেরই রূপান্তর ঘটছে তা নয়, ধীরে ধীরে যানবাহনেরও বিদ্যুতায়ন ঘটছে। ফলে এসব পরিবর্তন যেমন রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক, তেমনি একটি দেশের অর্থনৈতিক সফলতা ও নাগরিকদের কল্যাণের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও ভূমি ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন এক অর্থনীতির সূচনা হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই সুযোগ এই চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ফসকে যাওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। এটা কি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জন্য সুখকর হবে?

প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কোনো কূটনৈতিক মূল্য দিতে হবে না জেনেই ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্তত বোধ করেননি। কারণ, কিয়োটো প্রটোকল থেকেও যখন সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ বের হয়ে গেছেন, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তার চেয়েও মজার কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কখনো প্যারিস চুক্তিতে যুক্তই হয়নি! আন্তর্জাতিক চুক্তি পালনে একটি দেশ তখনই বাধ্য থাকে, যখন সে দেশ তার আইনসভায় সেই চুক্তিকে অনুসমর্থন করে। যেহেতু ওবামার আমলেও যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস রিপাবলিকানদের দখলে ছিল, সেহেতু প্যারিস চুক্তি কংগ্রেসে উত্থাপনই করা হয়নি। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ওবামা প্যারিস চুক্তি গ্রহণ করেছিলেন। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ হয়ে প্যারিস চুক্তি এগিয়ে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এই বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, তাকে ছাড়াও পৃথিবীকে রক্ষার প্রশ্নে দুনিয়ার সব মানুষ একতাবদ্ধ হতে পারে।

তবে প্যারিস চুক্তির সুফল পাওয়া যাবে ২০২০ সাল থেকে। এখনো অনেক কিছু চূড়ান্ত হওয়ার বাকি আছে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও এখন এই চুক্তি থেকে বের হতে পারবে না। কারণ, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে কোনো দেশ চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না। আর সেই প্রক্রিয়া শুরু হলে তা শেষ হতে আরও এক বছর লাগবে। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত এটা গড়াবে। ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে ৩ নভেম্বর। তার মানে পরবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প আবার নির্বাচিত হলেই শুধু এই চুক্তি থেকে বের হওয়া সম্ভব। বেশির ভাগ জনগণ যেহেতু চুক্তিতে থাকার পক্ষে, তাই মার্কিন জনগণের সামনেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ খোলা থাকবে।

এ ছাড়া ট্রাম্প সিনেটে প্যারিস চুক্তি পেশ করে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের মাধ্যমে তা বাতিল করতে পারেন। ওবামা তো নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন, সেটা সিনেটে পাস করাননি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এটা ট্রাম্পের জন্যও গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করবে। কারণ, ২০০৯ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ৯৪ শতাংশ আন্তর্জাতিক চুক্তিই সিনেটে অনুমোদন না করিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন।

অবশ্য ট্রাম্প চাইলে ইউএনএফসিসিসি থেকেই বের হয়ে যেতে পারেন। এতে মাত্র এক বছরের মধ্যেই চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ট্রাম্পেরই আরেক দলীয় পূর্বসূরি সিনিয়র বুশ সিনেটে অনুমোদন করিয়েছিলেন। ফলে এখান থেকে ট্রাম্প এককভাবে বের হয়ে গেলে আইনগতভাবে যেমন বাজে অবস্থায় পড়বেন, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব আরও খর্ব হবে। এতে করে আমেরিকাকে গ্রেট (মহান) বানানোর যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা কি আর রক্ষা হবে?

খলিলউল্লাহ্সহকারীসম্পাদকপ্রতিচিন্তাজলবায়ুপরিবর্তনবিষয়কগবেষক

khalil.jibon@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*