আন্তর্জাতিক জলবায়ু আদালত গঠনের দাবি বলিভিয়ার

বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটা বৈশ্বিক চুক্তির আশা করা হচ্ছে প্যারিস সম্মেলনে। আগামী ৩০ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য একত্রিত হবেন বিশ্বনেতারা। যদি শেষপর্যন্ত সর্বজনগ্রাহ্য একটা চুক্তি করা সম্ভবও হয়, তাহলেও সেই চুক্তির কার্যকর প্রয়োগ সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘চাপ প্রয়োগ’ ও ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’- এই দুই শব্দবন্ধই ব্যপকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে বৈশ্বিক অঙ্গনে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘শীর্ষে যাওয়ার দৌড়ের’ কথা। অর্থাৎ কোন দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা। কিন্তু চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে কোনোই উচ্চবাচ্য হচ্ছে না। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধান ক্রিস্টিনা ফিগারিজ বলেছেন, ‘যদি একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাখাও হয়, তাহলেও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না যে, এটা প্রযুক্ত হবেই বা এটা ভালো কিছুর দিকে নিয়ে যাবে।’

ইতিমধ্যে পরিবেশবিষয়ক ৫০০টিরও বেশি বৈশ্বিক, আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই থেকে গেছে অকার্যকর হিসেবে। নতুন কোনো চুক্তির পরিণতিও এমনটা হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখা সম্ভবপর হবে না। যে পরিস্থিতি পৃথিবীতে সৃষ্টি করবে আরও বেশি খরা-বন্যা-দাবদাহসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

বলিভিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্বমানুষের সম্মেলন’। সেখানে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আদালত গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন লাতিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক নেতারা।

বলিভিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্বমানুষের সম্মেলন’। সেখানে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আদালত গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন লাতিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক নেতারা।

এরকম ভয়ের জায়গা থেকেই বলিভিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রস্তাব করেছে একটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আদালত গঠনের। যেখানে বৈশ্বিক চুক্তিভঙ্গকারী দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। বলিভিয়ার পরিবেশ বিষয়ক প্রধান আলোচনাকারী ডিয়েগো প্যাচিও বলেছেন যে, এর চেয়ে কম কিছু হলে সেটা হবে ‘ধরিত্রী মাতার জন্য বিপদজনক’। কিন্তু প্যারিস সম্মেলনের আগে এই বিষয়টি এখন পর্যন্ত আসেনি কোনো রকম আলোচনায়।

ইউরোপিয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই একটা আইনি বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তির ব্যাপারে জোর দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু তারাও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওয়াজ তোলেনি। তারা বলছে চুক্তিতে একটা পর্যালোচনামূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত করার কথা। যেটার মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সব কিছু খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু কথা অনুযায়ী কাজ না করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে কেউই রাজি হচ্ছে না।

১৯৯৭ সালের কিয়েটো প্রটোকল প্রণয়নের সময়ও সেখানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত করার কথা হয়েছিল। কিন্তু উন্নত বিশ্বের প্রবল বিরোধীতার মুখে তা করা যায়নি বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক শীর্ষ জলবায়ু কর্মকর্তা ইভো ডি বোর। ২০০১ সালে অবশ্য একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে একমত হওয়া গিয়েছিল। সেসময় বলা হয়েছিল যে, ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যে উন্নত দেশগুলো গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না, তাদের জন্য ভবিষ্যতে আরও বেশি কঠিন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেবছরেরই মার্চে কিয়েটো প্রটোকলের বাইরে থাকার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জাপান, রাশিয়া আর কানাডাও তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। আর তারা কোনো শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে খুব সাধারণভাবে কিয়োটো প্রটোকলকে পাশ কাটিয়ে গেছে। এখন অবশ্য প্রটোকলের মেয়াদই আর নেই।

পৃথিবীকে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ৩৫০ পিপিএমের মধ্যে রাখার কথা। কিন্তু কয়েক দফা বিভিন্ন চুক্তি করা হলেও তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বিপদজনক গতিতে

পৃথিবীকে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ৩৫০ পিপিএমের মধ্যে রাখার কথা। কিন্তু কয়েক দফা বিভিন্ন চুক্তি করা হলেও তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বিপদজনক গতিতে

এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০টিরও বেশি দেশ জাতিসংঘে জমা দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা। যেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, সবাই এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখা সম্ভব হবে না এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ। তা বেড়ে যেতে পারে ২.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত।

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*