জেগে উঠছে আদিকালের জীবাণুরা!

অনলাইন ডেস্ক

১৭ মে ২০১৭, ১৮:১৪

পৃথিবীর ইতিহাসজুড়ে মানবজাতির পাশাপাশি টিকে আছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। প্লেগ থেকে শুরু করে গুটিবসন্ত, বিভিন্ন ধরনের জীবাণুকে আমাদের প্রতিরোধ করতে হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় এসব জীবাণুও আমাদের সংক্রমিত করার জন্য নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছে।

আলেক্সান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর প্রায় এক শতাব্দী ধরে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছি। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়াও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষের এই লড়াইয়ের কোনো শেষ নেই।

যা হোক, আমরা যদি হঠাৎ করে কয়েক লাখ বছর আগের ভয়ংকর সব ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হই, যাদের দ্বারা আগে কখনো আক্রান্ত হইনি, তখন কী ঘটবে? জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এখন আমাদের সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। কেননা জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ বছর ধরে বরফ-জমাট অবস্থায় থাকা মাটি (পারমাফ্রস্ট সয়েল) গলতে শুরু করেছে। আর ওই মাটিতে সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক কালের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। গলতে শুরু করায় সুপ্ত অবস্থায় থাকা এসব জীবাণু নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এবং ছড়াতে শুরু করেছে।

২০১৬ সালের আগস্টে সুমেরু বৃত্তের (আর্কটিক সার্কেল) মধ্যকার রাশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গম অঞ্চল সাইবেরিয়ান তুন্দ্রায় (ইয়ামাল উপদ্বীপ নামে পরিচিত) অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১২ বছরের এক বালক। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আরও কমপক্ষে ২০ জন লোক। ওই অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ৭৫ বছরের বেশি সময় আগে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে কোনো বলগা হরিণ মারা যায়। এরপর ওই পশুর বরফ-জমাট মৃতদেহ বরফ-জমাট মাটির একটি স্তরে আটকা থাকে। ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই মৃতদেহটি সেখানেই ছিল। উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হওয়ার পর বরফ গলতে শুরু করলে ওই মৃতদেহ থেকে ছড়িয়ে পড়ে অ্যানথ্রাক্স। প্রথমে ওই জীবাণু আশপাশের পানি ও মাটিতে ছড়ায়। পরবর্তী সময়ে খাবারের মধ্যে ছড়ায়। ওই অঞ্চলের দুই সহস্রাধিক বলগা হরিণ ওই অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়। এখন আশঙ্কা হলো এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।

পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, বরফ-জমাট মাটি তত গলতে শুরু করেছে। স্বাভাবিক পারিপার্শ্বিকতায় বরফ-জমাট মাটির উপরিস্থ ৫০ সেন্টিমিটার স্তর গলে যায় প্রতি গ্রীষ্মে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় বরফ-শীতল মাটির স্তর গলার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আর বরফ-জমাট মাটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার উপযুক্ত স্থান, হয়তো বা সেটা লাখ লাখ বছর। এর মানে দাঁড়ায়, বৈশ্বিক উষ্ণতায় বরফ গলতে থাকলে তা হবে রোগের প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাওয়ার মতো। সুমেরু বৃত্তের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বের অন্য স্থানের তুলনায় সুমেরু বৃত্তে তাপমাত্রা বাড়ার হার তিন গুণ বেশি। এতে করে বরফ এবং বরফ-জমাট মাটি গলতে থাকায় অন্য সংক্রামক জীবাণুগুলো ছড়াতে শুরু করবে।

ফ্রান্সের এক্স-মারসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী জ্যঁ-মিশেল ক্লেভারি বলেন, ‘ঠান্ডা, অন্ধকার এবং কোনো অক্সিজেন না থাকায় বরফ-জমাট মাটি জীবাণু ও ভাইরাসের খুবই ভালো সংরক্ষণাগার। বরফ-জমাট মাটির স্তরে থাকা ভাইরাস দ্বারা মানবজাতি ও পশু আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে এমন কিছু ভাইরাস রয়েছে, যেগুলো অতীতে বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্টি করেছে।’

শুধু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ১০ লাখের বেশি বলগা হরিণ অ্যানথ্রাক্সে মারা যায়। আর এসব পশুর মরদেহ মাটির খুব বেশি গভীরে পুঁতে ফেলা সহজ ছিল না। এসব মরদেহ রয়ে যায় মাটির উপরিভাগেই। এসব মরদেহের মধ্যে সাত হাজার রয়েছে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলে। তবে এই অ্যানথ্রাক্স কোনো বড় আশঙ্কা নয়, বড় আশঙ্কা হলো আর কী ধরনের জীবাণু এই বরফ-জমাট মাটির স্তরে লুকিয়ে রয়েছে। তারা কতটা ভয়ংকর।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বরফ-জমাট মাটিতে সমাধিস্থ হয়েছে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী। কাজেই এটা বোধগম্য যে সংক্রামক জীবাণুরা পুনরায় ফিরে আসতে পারে। যেমন আলাস্কার গণকবরে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পান ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু। গুটিবসন্ত ও প্লেগের জীবাণু লুকিয়ে রয়েছে সাইবেরিয়ায়।

২০১১ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষক বরিস রেভিচ ও মারিনা পোডোলনায়া উল্লেখ করেন, বরফ-জমাট মাটি গলে যাওয়ার মাধ্যমে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ভয়ংকর সব সংক্রামক জীবাণু ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে সেসব সমাধিস্থল-সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে, যেখানে ওই জীবাণুর সংক্রমণে মারা যাওয়া মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়েছে।

১৮৯০-এর দশকে সাইবেরিয়ায় গুটিবসন্তের বড় মহামারি হয়। একটি শহরের ৪০ শতাংশ মানুষ এই রোগে মারা যায়। কলিমা নদীর তীরে বরফ-জমাট মাটির উপরিভাগেই এসব মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়। ১২০ বছর পর কলিমা নদীর পানি উপচে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মাটির উপরিভাগ ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এদিকে ২০০৫ সালে নাসার বিজ্ঞানীরা আলাস্কার বরফ-জমাট পুকুর থেকে ৩২ হাজার বছর আগের প্লেইস্টোসিন যুগের একটি ব্যাকটেরিয়াকে পুনর্জীবিত করেন। এর দুই বছর পর ২০০৭ সালে বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার একটি হিমবাহের উপরিভাগ থেকে ৮০ লাখ বছর আগের একটি সুপ্ত ব্যাকটেরিয়াকে পুনর্জীবিত করেন। যদিও বরফ-জমাট মাটিতে সুপ্ত থাকা সব ব্যাকটেরিয়া পুনরায় জীবন ফিরে পায় তা নয়। তবে অ্যানথ্রাক্স, টিটেনাসসহ অন্য অনেক ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘ সময় পরেও সুপ্ত অবস্থা থেকে পুনর্জীবিত হতে পারে। কিছু ছত্রাকও দীর্ঘ সময় পর পুনর্জীবিত হতে পারে। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতা এখানে সরাসরি হুমকি নয়, পরোক্ষ হুমকি। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আর্কটিক সাগরের বরফ গলছে। এতে করে সাগর পথে ওই অঞ্চলগুলোতে মানুষের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, খনিজ ও সোনা খননের জন্য মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। আর এই খননই মানবজাতির জন্য দুর্যোগ বয়ে আনতে পারে।

২০১৪ সালে একদল গবেষক সাইবেরিয়ার বরফ-জমাট মাটিতে ৩০ হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকা দুটি বড় আকারের ভাইরাসকে পুনর্জীবিত করে। পুনর্জীবিত করার পরপরই ভাইরাস দুটি সংক্রামক হয়ে ওঠে। ওই গবেষণায় বলা হয়, অন্য অনেক ভাইরাসই একইভাবে পুনর্জীবিত হয়ে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। ওই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন জ্যঁ-মিশেল ক্লেভারি। তিনি বলেন, ‘সেখানকার বরফ-জমাট মাটি খনন শুরু হলে ওই মাটির প্রাগৈতিহাসিক স্তরে থাকা জীবাণু বের হয়ে আসতে পারে এবং তা দুর্যোগের সৃষ্টি করতে পারে।

ক্লেভারি বলেন, সুমেরু অঞ্চলে বাস করা আদিকালের মানুষেরা যেসব ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল, সেসব ভাইরাস পুনরায় ফিরে আসতে পারে। এমনকি দীর্ঘকাল আগে বিলুপ্ত নিয়ানডারথাল ও ডেনিসোভানস মানুষেরা যেসব ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়—সেই ভাইরাসগুলোও পুনরায় ফিরে আসতে পারে। নিয়ানডারথাল ও ডেনিসোভানসদের মরদেহ রয়েছে সাইবেরিয়াতে। ৩০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগের নিয়ানডারথালদের মরদেহ রাশিয়াতে শনাক্ত করা হয়েছে। মানবজাতির একটি বড় অংশের বাস ছিল সেখানে। লাখ লাখ বছর ধরে তাদের অনেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ক্লেভারি আরও বলেন, আর তাই যদি হয়, তবে পৃথিবী থেকে ভাইরাসকে নির্মূল করা সম্ভব; এই ধারণা ভুল। এটি আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভুল ধারণার জন্ম দেয়।

ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াগুলোর মধ্যে যেগুলো মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, সেগুলোর জেনেটিক সিগনেচারের সন্ধানে ২০১৪ সাল থেকে ক্লেভারি বরফ-জমাট মাটি ভেতরকার ডিএনএ উপাদান বিশ্লেষণ করে আসছেন। অনেক ব্যাকটেরিয়া মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে—এমন প্রমাণ তিনি পেয়েছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নাসার বিজ্ঞানীরা ঘোষণা দেন যে, তাঁরা মেক্সিকোর একটি খনিতে ১০ থেকে ৫০ হাজার বছরের পুরোনো জীবাণুর সন্ধান পেয়েছেন। জিনগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ওই জীবাণুটি স্বতন্ত্র। এটি নতুন প্রজাতির জীবাণু বলে তাঁরা ধারণা করছেন। এ ছাড়া নিউ মেক্সিকোর একটি গুহায় আরও পুরোনো একটি ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া যায়। ৪০ লাখ বছরের বেশি সময় ধরে ভূপৃষ্ঠে ওই ব্যাকটেরিয়াকে দেখা যায়নি।

এ ছাড়া যেকোনোভাবে ১৮ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে কিছু ব্যাকটেরিয়া। এর মধ্যে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেসব ওষুধ সর্বশেষ চিকিৎসা বলে বিবেচিত, সেই ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুও রয়েছে।

ক্লাভেরি বলেন, ‘আমাদের এবং অন্যদের গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, পুনর্জীবিত হয়ে জীবাণুরা আমাদের সংক্রমিত করতে পারে—এ আশঙ্কা রয়েছে। বরফ-জমাট মাটিতে সুপ্ত থাকা জীবাণুরা যদি দীর্ঘ সময় মানুষের সংস্পর্শে না এসে থাকে, তবে আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেসব জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রস্তুত নয়। কাজেই এসব জীবাণু বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’

বিবিসি অবলম্বনে লিখেছেন কৌশিক আহমেদ

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো: জেগে উঠছে আদিকালের জীবাণুরা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*