মাউন্ট আগুঙ্গ: ইন্দোনেশিয়ার এই আগ্নেয়গিরি নিয়ে কেন এত ভয়?

মাউন্ট আগুঙ্গ: ছবি-ভিডিওগুলো দেখতে গিয়ে হয়তো বারবার শিহরিত হচ্ছিলেন তাঁরা। মনে ভেসে উঠছিল হাজারো স্মৃতি। মিলিয়ে নিচ্ছিলেন নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। যদিও ব্যাপারটা তাদের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। কারণ ৫৪ বছর আগের এই স্মৃতিগুলো ছিল ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে অসহায় বনে যাওয়া দুঃসহ এক অভিজ্ঞতার।

মাউন্ট আগুঙ্গ

মনোরম প্রাকৃতিক নৈসর্গ্য ছড়ানো একটি পাহাড় আচমকা হয়ে উঠতে পারে, প্রাণঘাতি

মনোরম প্রাকৃতিক নৈসর্গ্য ছড়ানো একটি পাহাড় কিভাবে আচমকা প্রাণঘাতি হয়ে উঠতে পারে, সে অভিজ্ঞতা খুব ভালোমতো হয়েছিল, ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের বাসিন্দাদের। ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাউন্ট আগুঙ্গ আগ্নেয়গিরি ফুঁসে উঠেছিল প্রবলভাবে। মাসব্যাপী চলা এই অগ্নুৎপাতে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় দুই হাজার মানুষ। সেই সময়ের কিছু প্রামাণ্যচিত্র বিবিসি হাজির করেছিল প্রাণে বেঁচে যাওয়া বালি দ্বীপের কয়েকজন প্রবীনের সামনে। বলা হচ্ছিল তাদের কথাই। আর শুধু ছবি-ভিডিও-ই নয়, বাস্তবেও আরেক দফা তাদের সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে মাউন্ট আগুঙ্গ-এর রুদ্ররোষের সঙ্গে।

১৯৬৩ সালের পর নতুন করে কোন বিপদবার্তা বয়ে আনেনি মাউন্ট আগুঙ্গ আগ্নেয়গিরি। কিন্তু তাই বলে সেটি নিষ্ক্রিয়ও ছিল না। গত ৫৪ বছরে শক্তি সঞ্চয় করেই গেছে জীবন্তু এই আগ্নেয়গিরিটি। যার প্রভাব সম্প্রতি খুব ভালোমতোই টের পাওয়া যাচ্ছে।

মাউন্ট আগুঙ্গ

গত সোমবার (২৫ আগস্ট) মাউন্ট আগুঙ্গ আগ্নেয়গিরির আশেপাশে ঘটেছে ৮৪৪টি ভূমিকম্পের ঘটনা। আর গত মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ লিপিবদ্ধ হয়েছে ৩০০-৪০০ ভূমিকম্পের ঘটনা। এটাকে আসন্ন একটা অগ্নুৎপাতের লক্ষণ বলে মনে করছেন ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা ডেভি কামিল সাহবানা। গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমরা কখনোই মাউন্ট আগুঙ্গ থেকে এরকম উঁচু মাত্রার ভূ-তৎপরতা দেখিনি। আমাদের এটার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ, কারণ এই ধরণের ভূকম্পন একটা আসন্ন অগ্নুৎপাতের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৯৬৩ সালের সেই ভয়াবহ অগ্নুৎপাতের স্মৃতি এখনো ফিকে না হওয়ায়, সত্যিই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখছেন বালির অধিবাসীরা। মাউন্ট আগুঙ্গকে ঘিরে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা। আগ্নেয়গিরির আশেপাশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার মানুষকে। গত এক সপ্তাহ ধরে বাড়িঘর ছেড়ে এমন প্রায় ৫০০ নিরাপত্তা কেন্দ্রে আছেন লক্ষাধিক মানুষ।

৫৪ বছর আগে, মাউন্ট আগুঙ্গের সর্বশেষ অগ্নুৎপাতের সময় অবশ্য এত সতর্কতা অবলম্বনের কোনো সুযোগ ছিল না। হঠাৎ করেই তাঁরা পড়ে গিয়েছিলেন শক্তিশালী এই আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা উত্তপ্ত পাথর-গ্যাসের সামনে। কয়েক মাস ধরে চলা লাভা প্রবাহে ধ্বংস হয়েছিল অনেক ঘরবাড়ি-ফসলী জমি। যার জের টানতে হয়েছিল বেশ কয়েক বছর ধরে। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে এখনও শিউরে ওঠেন কেতুত সারি। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আকাশ থেকে আগুন গরম পাথরগুলো পড়ছিল। আমি মাথায় একটা বালতি নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমার সারা গা ছাই-য়ে ঢেকে গিয়েছিল। খুবই ভয় পেয়েছিলাম।’

১৯৬৩ অগ্নুৎপাতের আরেক প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেনগাহ নেসের মুখেও শোনা গেছে একই রকম অভিজ্ঞতার কথা, ‘আগ্নেয়গিরির ওপরে বিশাল আকারের মেঘের মতো তৈরি হয়েছিল। এরপরেই মাটিতে পড়তে থাকে ছাই-পাথর। মনে হচ্ছিল একসঙ্গে অনেকগুলো বোমা ফাটছে।’

এবারও যদি মাউন্ট আগুঙ্গ আরেকটি অগ্নুৎপাত ঘটায়, তাহলে হয়তো একই রকম অভিজ্ঞতাই হবে বালি দ্বীপের অধিবাসীদের। পার্থক্য একটাই, আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করায় এবার হয়তো প্রাণহানির পরিমাণ কমে আসবে অনেকটাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*