জলবায়ু পরিবর্তন: অদৃশ্য হওয়ার পথে কুতুবদিয়ার মৎসপল্লী

কথায় বলে, মাছে-ভাতে বাঙালী। বলবে নাই বা কেন? বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা নদীবিধৌত ছোট্ট এই ব-দ্বীপটির অধিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস এবং অর্থনীতির অনেকটাই গড়ে উঠেছে তাদের মৎসসম্পদের উপর নির্ভর করে।
দেশটির জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এককালে জীবিকা নির্বাহ করত মাছ ধরে, মাছ কেনাবেচা করে। এজন্যই এখানে উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন মৎসপল্লী। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কালের গর্ভে হারাতে বসেছে সেসব।

kutubdia1

বঙ্গোপসাগরের বুকের কুতুবদিয়া দ্বীপটির অনেকটাই ভাঙনের মুখে সাগরে তলিয়ে গেছে বিগত কয়েক বছরে। দ্বীপটিতে বাস করত প্রায় ২৫০ টি জেলে পরিবার, কিন্তু দ্বীপটি ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে থাকায় বিগত বছরগুলোতে কয়েক পুরুষের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তারা। সমূদ্রের কূল ঘেঁষে মাটি আঁকড়ে থাকা কয়েকটি গাছই এখন বেদনামধুর স্মৃতি হয়ে জেগে আছে দ্বীপটির বাসিন্দাদের জন্য। “এখানেই জন্ম আমার। আমার বাপ-দাদারও।”, বাঁধানো ঘাটে দাঁড়িয়ে হারানো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বললেন ২৫ বছর বয়সী অনু দাস, “এখানে আমাদের আম, সুপারি এবং নারকেল গাছ ছিল। এখন তার কিছুই নেই। আমাদের জীবন এখন খুবই কঠিন হয়ে গেছে। আমরা মাছ ধরে কোনমতে বেঁচে আছি।”

ঊষ্ণতার সীমারেখা:

জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বাজে প্রভাবগুলো পড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়। যার ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে বাংলাদেশের প্রায় ২৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল, জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের ভূমিকা সামান্যই। দুঃখজনকভাবে তাদের উপর দিয়েই বয়ে যাবে এর ঝড়-ঝাপটা। তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ কুতুবদিয়ার এক লাখ অধিবাসী। সংখ্যায় কম হলেও জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলোর অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায় তাদের। এমনকি দ্বীপটিতে পর্যাপ্ত বিদ্যুতও পান না তারা। দ্বীপটিকে সমুদ্রের ভাঙন থেকে বাঁচাতে সরকারের বানিয়ে দেয়া বাঁধটি ছাপিয়ে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে দ্বীপে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। বাঁধে ফাটলও ধরেছে বেশ কিছু জায়গায়।
কুতুবদিয়ায় কোন বৈজ্ঞানিক জরিপ না করা হলেও, সেখান থেকে ৫০ মাইল দূরে মূল ভূখন্ড কক্সবাজারে গত ২০ বছরে সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে বছরে ৮ মিলিমিটার, যা বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ সীমার প্রায় তিনগুণ বেশি, এবং সারাবিশ্বের গড়ের তুলনায় ৫ গুণ।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে বছরে ৬-২০ মিলিমিটার

“সমুদ্র আমাদের উপর অত্যাচার করছে”, বলছিলেন তিন সন্তানের জননী পুষ্প রানী দাস, “আমরা এটাকে থামাতে পারি না। প্রতিবার বড় কোন ঢেউ আসার সাথে সাথে আমার ঘরবাড়িতে জল ঢুকে যায়, বিশেষ করে বর্ষাকালে।’ জল থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত চারবার বাসস্থান পাল্টাতে হয়েছে তাদের। তিনি আশংকা করছেন খুব শিগগিরই তার পরিবারকে দ্বীপটি একেবারেই ছেড়ে চলে যেতে হবে। তার বাসস্থান থেকে মাত্র ৩০০ ফিট দূরেই জলে ভেসে গেছে একটি নির্মাণাধীন মসজিদ।
বাঁধের কোল ঘেঁষে কোনমতে টিকে থাকা এই মৎসজীবিরা বাধ্য হয়ে শিখতে শুরু করেছেন, কীভাবে প্রকৃতির ক্রোধের মুখে টিকে থাকতে হয়। যখন ঘূর্ণীঝড় আসে, তারা তাদের ছোট সন্তানদের কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে চলে যান। এই শেল্টারগুলোর কারণে ঘূর্ণীঝড় ও জলোচ্ছাসে মৃত্যুহার অনেকটা কমে এসেছে। তবে বিগত বছরগুলোতে ঘূর্ণীঝড়ের পরিমাণ এবং তীব্রতা অনেক বেড়ে গেছে বলে জানান তারা। ফলে তাদের এখন বাঁচার জন্য লড়তে হচ্ছে তাদেরই জীবিকার একমাত্র সম্বল, সমুদ্রের সাথে।

kutubdia2
“ঘূ্র্ণিঝড়ের সংকেত আসা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে, ১৫-২০ বছর আগেও এত ঘনঘন আসতো না”, কড়া রোদে ভ্রু কুঁচকে বলছিলেন সত্তুর বছর বয়স্ক বৃদ্ধ জেলে জগৎহরি জলদাস, “এই যে এখন কত গরম, অথচ এখন তো শীত পড়ার কথা। আর সিগনাল পেলে তো আমরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারি না, কারণ এরপর কীরকম বিপদ আসতে পারে আমরা কেউই জানি না।”
ঐ এলাকার জেলেরা এখন আর উপকূলবর্তী অগভীর জলে মাছ শিকার করেন না কারণ জলের ঊষ্ণতা বাড়ায় সেখানে আর তেমন মাছ পাওয়া যায় না। ফলে তাদের ১০-১৫ ঘন্টা নৌকায় চড়ে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরতে হয়। কিন্তু এ বছর ঘনঘন সিগনাল আসায় তারা মাছ ধরতে যেতে পারেননি। ফলে তাদের আয়ে কমতি হয়েছে। মাছ ধরতে না পারলে কী করেন জিজ্ঞেস করলে হরি হেসে বলেন, “কী আর করব! আর কিছুই তো করতে পারি না। মাছ ধরতে পারলে খাই, নয়তো না খেয়ে থাকি। সমুদ্রই আমাদের সবেধন নীলমণী।”

মৃত্যুর সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বাঁচেন তারা। গতবছর ৮৯ জন জেলে সাগরে নিখোঁজ হয়েছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায় গতবছর রোয়ানু, কিয়ান্থ, নাদা এবং ভরদা নামে চারটি ঘূ্র্ণিঝড় হয়েছে, যেখানে সাধারণত বছরে একটিই বড় ঘূর্ণীঝড় হয়ে থাকে। আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক জানান, বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনটি নিম্নচাপ হয়ে থাকে, সেখানে গতবছর হয়েছিল সাত-আটটি। আর ঘূর্ণীঝড়ও হয়েছে চারটা, যা অন্য যেকোনবারের তুলনায় বেশি।
এছাড়াও, ঋতু পরিবর্তনের গতিপথ বদলে গেছে। বর্ষাকাল, যার স্থায়িত্ব আগে ছিল জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, তা গত দুই বছরে অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে, এবং তা স্থায়ী হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময়।

১৯৯১ সালের বিশাল জলোচ্ছাসের পর প্রায় ২০ টি গ্রামের মানুষকে সরকারিভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তাদের বর্তমান আবাস কক্সবাজার বিমানবন্দরের পেছনে গড়ে ওঠা ‘কুতুবদিয়া পাড়া’-তে, কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের ছাউনিঘরে। কিন্তু তাদেরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিৎ। সরকার চায় তারা অন্য কোথাও সরে যাক, যাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটন নগরীটির বিমানবন্দরের জায়গা বাড়ানো যায়।

kutubdia3

নিয়তির দিকে চেয়ে দিনাতিপাত করছেন কুতুবদিয়ার হতভাগ্য এই জলবায়ু-উদ্বাস্তুরা। তবে কি লোকগীতি’র মত ঠাকুরজামাই ঘরে এলে তাকে আপ্যায়নের জন্য কাকে আর জেলে পাড়ায় পাঠানো যায় তা নিয়ে আর ভাবনায় পড়তে হবে না গিন্নীকে? মৎসজীবিদের এই করুণ পরিণতি ‘মাছে-ভাতে বাঙালী’ প্রবাদটাকে অতীত করে দেবে না তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*