রামপাল প্রকল্পের ছত্রছায়ায় ফায়দা লুটছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা

পশুর নদী ও সুন্দরবনের পাশে নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন  মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ওরফে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে নির্ধারিত জমিতে সোৎসাহে চাষাবাদ ও মৎস খামার শুরু করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। ২০১২ সালে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে জমি হস্তান্তরের প্রায় সাথে সাথেই স্থানীয় এক আইনজীবির সহায়তায় রামপালের জন্য বরাদ্দ ৫৫৫ হেক্টর জমিটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হাতিয়ে নিয়েছে এই নেতারা। ওদিকে এই জমিগুলোর প্রকৃত মালিকদের কাউকে কাউকে জমির নামেমাত্র মূল্য দিয়ে সেখান থেকে উৎখাত করা হয়েছে, অনেকে আবার সেটাও পাননি। ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের এক অনুসন্ধানীর প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।

দেশ-বিদেশের পরিবেশবাদীদের তীব্র আপত্তির মুখেও ২০১৬ সালের ২২ শে জুলাই এই প্রকল্পের চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ সরকার। যদিও তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে রামপাল প্রকল্পের ফলে পরিবেশের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন তারা, তবে তা মানতে নারাজ পরিবেশ-সচেতনরা। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ৫৫৫ হেক্টর জমির মধ্যে মাত্র ২৪১ হেক্টর জুড়ে নির্মিত হচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাকিটা স্থানীয় নেতাদের কুক্ষিগত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জমি দখলে জড়িত আছে রামপাল সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এবং রামপাল আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি, রাজনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, গৌরম্ভা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এবং গৌরম্ভা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাগেরহাট ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের মহাপরিচালকের মত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার আবুল হান্নান ডাবলু বলেন, “এই জমিটা পাওয়ার জন্য আমরা মুখ্য ভূমিকা রেখেছি। এসব গ্রামে যত দুষ্কৃতীদের দল হামলা করত আমরা তাদের আটকেছি, এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে যারা লংমার্চ করে বিশৃংখলা সৃষ্টি করত তাদেরও আটকেছি। আমরা শুধু এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্তই জমিটা ব্যবহার করব। আমরা তালুকদার সাহেবের (তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি) নির্দেশেই কাজ করছি।

গৌরম্ভা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াসুদ্দিন গাজীও স্বীকার করেছেন যে, তারা স্থানীয় আইন প্রণয়নকারী সংস্থার হয়েই কাজ করছেন। “আমাদের চাষাবাদে কোন আগ্রহ নেই।”, তিনি বলেন, “প্রকল্পের কাজ নির্বিঘ্নে চলুক এটাই আমি চাই। আমাদের নেতা (তালুকদার) চান আমরা যেন জমিটি রক্ষা করি, আর তাই আমরা জমিটা প্রাণ দিয়ে রক্ষা করছি।”

তিনি গর্বের সাথে আরও মনে করিয়ে দেন যে অতীতে তারা পুলিশের কোনপ্রকার সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র দলীয় কর্মীদের দিয়েই বিভিন্ন আন্দোলন তারা বানচাল করতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে রামপাল উপজেলা চেয়ারম্যান জামিল হাসান জামু’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জমি দখলের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “কোনো মন্ত্রী বা সচিব না আসলে আমি সাধারণত ওখানে যাই না। এগুলো সব মিথ্যে অভিযোগ।” তিনি আরও যোগ করেন যে এই চাষাবাদের ব্যাপারে কিছুই জানেন না, রাজনগর আর গৌরম্ভা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যানরা জানলে জানতে পারেন।

ওদিকে গৌরম্ভার সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম সরদার দাবী করেন তিনি এককালে ঐ অঞ্চলে চিংড়ি চাষ করেছেন, তবে বর্তমানে আর করেন না। তখন বাগেরহাট জেলাপরিষদের নির্বাহী শেখ কামরুজ্জামান টুকু বলেন বছরদুয়েক আগে তার ঐ এলাকায় ঘের ছিল, সেখানে বর্তমানে স্থানীয়রা মাছ চাষ করে থাকতে পারে, তবে তিনি এ বিষয়ে আর কিছু জানেন না। এছাড়াও বাগেরহাটের ডেপুটি কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি দখল নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোন অভিযোগ আসেনি।  তিনি দাবী করেন, তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের কোন জমি দখল করা হয়নি। আরও তথ্যের জন্য তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি’র সাথে বেশ কয়েকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।  সর্বশেষ ২৭  জানুয়ারি চেষ্টা করে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। অপরদিকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্বাহী মহাব্যবস্থাপক দেবদত্ত রায় বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

রামপালে রামভয়

রামপাল প্রকল্প নিয়ে কোন প্রশ্ন করা হলে স্থানীয়রা জবাব দিতে দ্বিধাবোধ করেন। কিসের যেন ভয় পান তারা। খুব কমজনই সুন্দরবন রক্ষার ব্যাপারে কথা বলেন। অধিকাংশই প্রচারমাধ্যমে এই ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি। এমনকি তারা সাংবাদিকদের প্রকল্পের কেন ছবি তুলতেও নিষেধ করেন। ইতপূর্বে বেশ কয়েকবার দলীয় পান্ডারা বিক্ষোভকারী ও সাংবাদিকদের ক্যামেরা, মুঠোফোন, কলম, ইত্যাদি ছিনিয়ে নিয়ে হয়রানিও করেছে। এ ছাড়াও স্থানীয়দের প্রকল্পের ত্রিসীমানায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুলিশ ঐ এলাকার আশেপাশে ১৪ টি স্থানে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

বেহাত হবে আরও জমি

মংলা-খুলনা থেকে বিদ্যুৎপ্রকল্পটিতে যাওয়ার রাস্তাটা এখনো নির্মাণাধীন। যে নিম্নভূমিতে স্থানীয়রা এককালে মাছ চাষ করতেন তা পশুর নদীর সাথে সংয়ুক্ত। জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রবেশদ্বারের কাছে মইদরা নামক একটি নদীর মুখে বাঁধ বসিয়েছে নির্মাতারা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে নদীর গতি, বিঘ্নিত হচ্ছে মাছ চাষ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে গত তিনমাস ধরে এ কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রাজনগর আর গৌরম্ভা ইউনিয়নের মৎস খামারগুলো। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পটির দক্ষিণাংশের প্রায়। ২০০ হেক্টর জমি রয়েছ স্থানীয় ডাবলু চেয়ারম্যানের দখলে এবং ২৮০ হেক্টর আছে স্থানীয় আরও নেতাদের দখলে।

মইদারা গ্রামের বাসিন্দা অমর মিস্ত্রী বলেন, “আমি প্রকল্প নিয়ে কিছু বলতে চাই না, তবে এটি কাজ শুরু করলে পশুর নদীতে আর একটাও শুশুক বাঁচবে কি না আমার সন্দেহ হয়।” “নিরাপত্তাকর্মীরা আমাকে সাতদিনের মাথায় এই জায়গা ছাড়তে বলেছে, অন্যথায় তারা আমার ছোট্ট কুঁড়েঘরটি গুঁড়িয়ে দেবে। “, বললেন নিজ বাসভূমি থেকে উৎখাত হওয়া এক ভূমিহীন মহিলা।

অপরদিকে দেখা যায়, বেশ বড়সড় একটুকরো জমি যা এককালে মাছ ধরার স্থান ছিল তাতে নদীর তল থেকে বালু তুলে এনে তা ভরা হচ্ছিল। জানা যায়, ওরিওন গ্রুপ ঐ অঞ্চলে ১২০ হেক্টরের মত জায়গা কিনে সেখানে ৫৬৬ মেগাওয়াটের একটি তাপবিদ্যুকেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা করছে। তাই বালু তুলে আনা হচ্ছিল। উচ্ছেদ হওয়া অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এখন গৌরম্ভা ইউনিয়নের বর্ণি নামক গ্রামে থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক অধিবাসী অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ তার ২.৪ হেক্টর জমি নিয়ে কেবল তার আংশিক দাম দিয়েছে।

মেঘলা ঘোষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা কমিটি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী এমএ সবুর রানা বলেন, এই জমিদখলের ফলে ঐ অঞ্চলে জনগণের জীবনযাত্রা এবং জীবিকয় নির্বাহে বড়সড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শত শত মানুষ তাদের উর্বর চাষের জমি এবং সচল মৎস খামার হারিয়ে হয়ে পড়েছে সহায়সম্বলহীন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*