আমরা কবে প্রকৃতির কাছে নতজানু হব?

ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত যুদ্ধ কি লেগেই গেছে? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে যাচ্ছে? সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ কোন দিকে গড়াবে- এজাতীয় খবরেই ভরপুর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। এদিকে মানুষের অত্যাচারে ধরিত্রী মাতার যে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, সে খবর খুব কমই শোনা যাচ্ছে। যদিও প্রকৃতি রুষ্ঠ হওয়ার পরিণাম যে ভালো হয় না, সেটাও টের পাওয়া যাচ্ছে ভালোমতোই।

hurricane matthew haiti

কয়েক দিন আগেই ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার একটি ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে হাইতিকে। মারা গেছে এক হাজারেরও বেশি মানু্ষ। এখনও একটা ঘূর্ণিঝড় ফিলিপাইনকে তছনছ করে এগিয়ে গেছে হংকং-চীনের দিকে। ‘টাইফুন হাইমা’ ছিল এই অঞ্চলে এক সপ্তাহের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়। কয়েক দিন আগে ‘টাইফুন সারিকা’ নামের আরেকটি ক্যাটাগরি-৩ মাত্রার শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে নাকাল হয়েছিল ফিলিপাইন-হংকংয়ের মানুষ।

গত দুই-এক মাসের মধ্যে এর আগেও দেখা গেছে টাইফুন মেগি, টাইফুন মেরান্তি, টাইফুন চাবা, হ্যারিকেন নিকোলের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। মনুষ্য সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা যে আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সে ব্যাপারে অনেক দিন ধরেই সতর্ক করছেন বিজ্ঞানী-গবেষকরা। আর সেই আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন সম্ভবত এখনই অনুভূত হচ্ছে।

sarika haimaপশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থানগত কারণে ফিলিপাইনকে বছরে গড়ে ২০টি করে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সামলাতে হয়। তারপরও এক সপ্তাহে দুইটি ক্যাটাগরি-৩ বা তার বেশি ঘূর্ণিঝড় খুবই বিরল ঘটনা।

দক্ষিণপশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এবছর দেখা গেছে চারটি ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়। এত দিন এখানে বছরে গড়ে দেখা যেত এমন দুইটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। আর বৈশ্বিকভাবে সব মিলিয়ে এবছর দেখা গেছে সাতটি ক্যাটাগরি-৫ বা সর্বোচ্চ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়। এটাও বাৎসরিক গড় হিসেবের অনেক ওপরে।

ঘূর্ণিঝড়গুলো শক্তি সঞ্চয় করে সমুদ্রের উষ্ণ পানি থেকে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সেই সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সমুদ্রের এই অধিক উষ্ণ পানিতে দ্রুতই অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করছে ঘূর্ণিঝড়গুলো। বেড়ে যাচ্ছে তাদের তীব্রতা। এমনটাই জানাচ্ছেন নোয়ার বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, এমন হতে পারে যে আগামীতে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কিছু কমে আসল। কিন্তু যে ঘূর্ণিঝড়গুলো তৈরি হবে সেগুলো হয়ে উঠবে প্রলয়ঙ্করী।

প্রকৃতির রুদ্ররোষের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। জাতিরাষ্ট্রের নামে মানুষ নিজেদের মধ্যে দেয়াল তুললেও ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের নেই কোনো সীমানা-জ্ঞান। ভূমিকম্প সমানভাবেই কাঁপায় ধনী বা গরিব, ছোট বা বড়; সব দেশকে। ঘূর্ণিঝড় একইভাবে ধেয়ে যায় উপকূলের দিকে। সেগুলো রুখবার কোনো সাধ্য আমাদের নেই। পুরো পৃথিবীর ওপর দাপট দেখিয়ে বেড়ালেও টাকা বা ক্ষমতা দিয়ে প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় আটকে দেওয়ার মতো সামর্থ্য মানুষের হয়নি, কখনো হবেও না। প্রাণহানি এড়ানোর একটাই উপায়। মানিয়ে চলতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে। রক্ষা করতে হবে ধরিত্রীর স্বাভাবিক ভারসাম্য। কিন্তু সেটা আমরা কতখানি করছি, প্রকৃতির সামনে নতজানু হওয়ার মতো সুবুদ্ধি আমাদের হয়েছে কিনা, তা নিয়ে ঘোর কাটছে না।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে প্রথমবারের মতো একটি জলবায়ু চুক্তি সাক্ষর করেছেন বিশ্বনেতারা। আগামী নভেম্বরে এই চুক্তির কার্যকারীতা শুরু হবে বলে আশাবাদী জাতিসংঘ। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। এটা আদৌ কার্যকরীভাবে প্রযুক্ত হবে কিনা, তা নিয়ে আছে সংশয়। তবে তারপরও পৃথিবীর অবস্থা যে সত্যিই খুব বিপন্ন, বৈশ্বিকভাবে সেই স্বীকৃতি মিলেছে এই চুক্তির মাধ্যমে। পুরো বিশ্ব একমত হয়েছে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে। এটা একটা ইতিবাচক বিষয়।

কিন্তু প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করা কী আদৌ সম্ভব? নাকি আমরা পা দিয়ে ফেলেছি প্রলয়ঙ্করী ভবিষ্যতের দিকে? জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক শিল্পায়ন সময়ের তুলনায় দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশ নিচে রাখা হবে একমত হয়েছে পুরো বিশ্ব। এখনই যেটা বেড়ে গেছে প্রায় এক ডিগ্রী। ২০১৫ সালের পর ২০১৬ সাল গড়তে যাচ্ছে উষ্ণতার নতুন রেকর্ড। বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রীনহাউজ গ্যাস।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ রাখতে হবে ৪৫০ পিপিএমের ভেতর। কিন্তু এবছর সংখ্যাটা পাকাপাকিভাবে ৪০০ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই ৪৫০ পিপিএমের সীমারেখা অতিক্রম করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

অথচ প্রকৃতির এই বিপন্ন অবস্থার মধ্যে বেজে উঠছে যুদ্ধের দামামা। এখন যেখানে সবাই একজোট হয়ে পরিবেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত হওয়া দরকার, সেখানে ক্রমেই বাড়ছে নানাবিধ রাষ্ট্রীয়, জাতিগত দ্বন্দ্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে বাংলাদেশ পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপন্ন; সাইক্লোন আইলা, সিডরের স্মৃতি এখনও যেখানে মুছে যায়নি, সেই বাংলাদেশে স্থাপন করতে চাওয়া হচ্ছে পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র। সেটাও আবার সুন্দরবনের মতো প্রাণবৈচিত্র্যপূর্ণ একটা বনাঞ্চলকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ, বৈশ্বিক উদ্বেগ; কোনো কিছুই টলাতে পারছে না বাংলাদেশ সরকারকে। ফলে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কী সুবুদ্ধি হয়েছে বা হচ্ছে রাষ্ট্রনেতাদের? নাকি জলবায়ু চুক্তি, পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ; এগুলো শুধুই লোক দেখানো? ক্ষমতায় টিকে থাকার অনেক কৌশলের একটি? আমরা তাহলে কবে শুধু প্রকৃতির কাছেই নতজানু হব? সময় যে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*