ছোট ছোট পরিবর্তন রূপ নিতে পারে বড় কিছুতে

ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন। আপাত দৃষ্টিতে যেগুলোর প্রভাবও তেমন বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ছোট ছোট এসব পরিবর্তন একত্রিত হয়ে রূপ নিতে পারে অনেক বড় কিছুতে। জলবায়ুর ক্ষেত্রে পৃথিবী পার করছে ঠিক তেমনই একটা পরিস্থিতি। আর প্রতিনিয়ত এধরণের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো ঘটতে দেখে ঘুম হারাম হওয়ার দশা জলবায়ু বিজ্ঞানীদের। বলাই বাহুল্য যে এই পরিবর্তনগুলোর অধিকাংশই ঘটেছে মনুষ্যসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে। মানুষ অজান্তেই তার সীমা অতিক্রম করে ফেলছে, এবং একবার দুর্যোগ শুরু হলে আর পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ থাকবে না। সম্প্রতি এমন আশঙ্কার কথাই শোনা গেছে বিজ্ঞানীদের মুখে।

বিশাল বরফচাদর যা যে কোন মুহূর্তে গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০-১২ মিটার বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা শক্তিশালী সামুদ্রিক স্রোত যা আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে তীব্র শীতকে দূরে সরিয়ে রাখে অথবা এশিয়ার খাদ্যভান্ডার বলে খ্যাত আবাদী অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ; সব কিছুই আছে টলোমলো অবস্থায়। “কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে শেষ সীমা অতিক্রম করে গেলে আর ফেরা যাবে না”, বলছিলেন মার্কিন গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্টারের উপ-প্রধান বেন স্ট্রস, “যেমন  তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা ছাড়িয়ে গেলে আন্টার্কটিকার বরফ গলে এক মহাপ্লাবন সৃষ্টি করবে, যা পরবর্তীতে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে গেলেও থামবে না।” সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিব্রেন ড্রিফাউটের মতে পরিস্থিতিটা কেউ চেয়ারের পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে বসে থাকার মতই নাজুক, “অবস্থাটা এমন যে সামান্য একটা ধাক্কাতেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।”

20140328-uncertainty-600x298

মেরু অঞ্চলে এর প্রভাব কিভাবে পড়বে তা সকলেরই জানা।  ভূমি ও সাগর জুড়ে বিস্তৃত থাকা মজবুত বরফপ্রাচীর কাজ করে একটা সীমানা হিসেবে। যা বড় বরফখণ্ডগুলোকে ধ্বসে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করে। শুধুমাত্র দক্ষিণ এ্যান্টার্কটিকার বরফ গললেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ছয় মিটার বেড়ে যাবে। তারপর যদি আরও ১০০ বছর ধরেও পৃথিবীকে শীতল করা হয় তবুও ঐ বরফপ্রাচীরগুলো বরফধ্বস আটকানোর মত অবস্থায় ফিরে যাবে না, এএফপিকে জানান স্ট্রস।

কী ঘটতে চলেছে তার খানিকটা ধারণা দেয়ার জন্যই যেন ভাঙতে চলেছে এ্যান্টার্কটিকার লার্সেন সি নামের বিশাল বরফখন্ড। যা আকারে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটন শহরের চাইতেও ১০০ গুণ বড়। এ বছরের শুরুতেই এই দুঃসংবাদ জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও একেকটা অংশ গলতে কত সময় লাগতে পারে এ বিষয়ে তারা অনিশ্চিৎ। স্ট্রসের ভাষ্যমতে, “আমরা ঠিক জানি না আমরা এই সীমারেখাগুলো থেকে কত দূরে কিংবা এর মধ্যেই আমরা কোনটা অতিক্রম করে ফেলেছি কি না।”

নাসা’র গোডার্ড ইনস্টিটিউট অফ স্পেইস স্টাডিজের সাবেক প্রধান জেমস হ্যানসেন মনে করেন, যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে তাতে এই শতাব্দীর মাঝেই বরফখন্ডগুলো গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মিটারদুয়েক বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, মানুষের এখনো ভূপৃষ্ঠে নিরাপদভাবে টিকে থাকার মত পরিস্থিতি আছে, যদিও সেটা সেভাবে কতদিন থাকবে সেই আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

আরেকটি বিষয়  নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। সেটা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ হিমায়িত অঞ্চল বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া। রাশিয়া, কানাডা ও উত্তর ইউরোপের কোন কোন অংশের এমন পারমাফ্রস্ট গলে গেলে যে পরিমাণ মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে, তার পরিমাণ প্রায় ১৫ বছরে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসৃত গ্রীনহাউজ গ্যাসের সমপরিমাণ। পারমাফ্রস্ট গলে গিয়ে এই গ্যাসগুলো বেরিয়ে আসলে তা বৈশ্বিক ঊষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

120629_d8h_49122

একইভাবে, অগভীর সমুদ্রগর্ভে জমাট বাঁধা মিথেন হাইড্রেটের খন্ডগুলো, যা বহু মিলিয়ন বছর আগে বৈশ্বিক ঊষ্ণায়ন ঘটিয়েছিল, সেগুলো এখন আবার বিক্রিয়া শুরু হলে ঠিক কী ঘটতে পারে তা বিজ্ঞানীদের আজও অজানা।

“যদি বৈশ্বিক ঊষ্ণায়নকে প্যারিসের জলবায়ু চুক্তি মোতাবেক বছরে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৩.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) নিচেও আটকে রাখা যায়, তবুও জলবায়ু পরিবর্তনের কোন কোন প্রভাবককে উসকে দেয়া হতে পারে কিংবা হয়তো এরই মধ্যে হয়ে গেছে”, বলেন জার্মানির পটসড্যাম পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হ্যান্স জোয়াশিম শেন্যুবার। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা যায় তাহলে প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলেও হতে পারে- এমনটাও যোগ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে যেসব যন্ত্র বা প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবীর জলবায়ুর বিভিন্ন বিষয়আশয় নজরে রাখছেন, সেগুলো একটা স্থিতিশীল, স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু আচমকা বড় কোনো পরিবর্তনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত নন। “সাধারণ দৃষ্টিতে (আমাদের যন্ত্রগুলোর চোখে) জলবায়ু পরিস্থিতি বেশ স্থিতিশীল”, বলছিলেন ড্রিফাউট, “তারা ধীরগতির পরিবর্তন মাপতে সক্ষম, কিন্তু হঠাৎ কোন বড় পরিবর্তন দেখা দিলে তা তাদের চোখে ধরা পড়বে না। বিশেষ করে এমন পরিবর্তন যার অতীতে কোন রেকর্ড নেই।” এদিকে অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বলে মন্তব্য করেছেন বোর্দ্যু বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিয়ের সুইঙ্গড্যু। তিনি বলেছেন “সমস্যা হল, আমাদের কোন নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই যা দ্বারা আমরা নিশ্চিত হতে পারি আমরা কিসের মুখোমুখি হতে চলেছি।”

বর্তমানে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বিগত তিন মিলিয়ন বছরের মাঝে সর্বোচ্চ, এবং এটা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনটা গত ৬৬ মিলিয়ন বছরে দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিগুলো তো মনুষ্যপ্রজাতীর জন্য নতুনই বলা চলে।

clouds_opener

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*