পারমাণবিক বিদ্যুৎ: মরীচিকার নির্মম বাস্তবতা

শাহেরীন আরাফাত

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি বিদ্যুৎ সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোটা অপরিহার্য। জীবাশ্ম জ্বালানি বারবার ব্যবহার করা সম্ভব নয়, আবার বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদও সীমিত। আর তা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাস্তব ও টেকসই সমাধান হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এ ধরনের জ্বালানির অন্যতম একটি ক্ষেত্র হলো পারমাণবিক শক্তি। পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে বা বিভাজন করে যে শক্তি পাওয়া যায়, তাকেই পারমাণবিক শক্তি বলে।

মূলত সত্তরের দশক থেকে একদিকে যেমন পারমাণবিক জ্বালানির বিস্তার ঘটছিল, অন্যদিকে এ জ্বালানির তেজস্ক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি আর্থসামাজিক ও ভৌগোলিক ক্ষত সৃষ্টির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতাও গড়ে উঠতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে যা আরো জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এর মূল কারণ হলো, গত কয়েক দশকে বেশকিছু পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঘটনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক অগ্রসরতা। বাংলাদেশও পারমাণবিক বিদ্যুতের মরীচিকার দিকেই পা বাড়াচ্ছে। আর তাই এ সম্পর্কে আমাদের জানাবোঝার পরিধিটা বাড়ানো একান্ত জরুরি।

Nuclear Power Project

পারমাণবিক কেন্দ্রের গঠন প্রক্রিয়া

পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে পারমাণবিক চুল্লিতে (Nuclear Reactor) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের দহনে তাপ উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন তাপ বয়লার সিস্টেমের মাধ্যমে পানিকে বাষ্পীভূত করে। উৎপাদিত বাষ্প স্টিম টারবাইনকে সক্রিয় করে। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত অল্টারনেটর (এক ধরনের জেনারেটর) বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অল্টারনেটরের একটি বিশেষ অংশ মোটর, ইঞ্জিন বা অন্য কোনো উপায়ে ঘোরালে বিবর্তিত বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ সৃষ্টি হয়। এ ব্যবস্থা যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করে।

মৌলের পরমাণুতে থাকে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। পরমাণুতে সামগ্রিকভাবে কোনো চার্জ থাকে না। যেহেতু নিউট্রন চার্জবিহীন, সেহেতু পরমাণুতে ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংখ্যাও থাকে সমান। কারণ প্রোটন ও ইলেকট্রনের আধান বিপরীতধর্মী ও সমপরিমাণের। একই মৌলের বিভিন্ন পরমাণুর কয়েক প্রকারের ভর হতে পারে। (ভর = প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা)। যেসব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু ভর সংখ্যা ভিন্ন হয়, সেসব পরমাণুকে পরষ্পরের আইসোটোপ বলা হয়। অর্থাৎ নিউট্রনের সংখ্যার তারতম্যের জন্যই আইসোটোপের সৃষ্টি।

বিভাজন বিক্রিয়ায় (Fission) ভারী পরমাণুর কেন্দ্রগত (নিউক্লিয়াস) ভাঙনের ফলে যে শক্তি অবমুক্ত হয়, তা রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত শক্তির ১০ লাখ গুণ বেশি। ফিশনের শাব্দিক অর্থ বিভাজন। একটি ভারী পরমাণুকে দ্রুতগামী নিউট্রন দ্বারা ভেঙে হালকা ভরের একাধিক পরমাণু ও শক্তি উৎপন্ন করার প্রক্রিয়াকে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে কাজে লাগানো হয়। যেসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ এ বিভাজন বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাদের ফিসাইল পদার্থ বা পারমাণবিক জ্বালানি বলা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় আইসোটোপ।

ইউরেনিয়াম-২৩৫ (৯২+১৪৩) একটি সুস্থিত (stable) তেজস্ক্রিয় পদার্থ, যার প্রতিটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৯২টি প্রোটন ও ১৪৩টি নিউট্রন আছে। এর পরমাণুতে বাইরে থেকে একটি নিউট্রন ঢুকিয়ে দিলে এটি ইউরেনিয়ামের অস্থিত (unstable) আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৬-এ পরিণত হয়। এ আইসোটোপটি নিজের অস্তিত্ব বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। তাই পরমাণুটি ভেঙে দুটি সুস্থির পরমাণুতে (ক্রিপটন ও ব্যারিয়াম) পরিণত হবে। ভেঙে যাওয়ার প্রাক্কালে পরমাণুটি প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন করে দুটি অতিরিক্ত নিউট্রনকে মুক্ত করে। মুক্ত নিউট্রন দুটি আবার ইউরেনিয়ামের নতুন দুটি পরমাণু ভেঙে চারটি নিউট্রনকে মুক্ত করে। এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর অস্তিত্ব থাকে। এ ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বলা হয় চেইন রিয়েকশন। চেইন রিয়েকশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে তাপশক্তি বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। যেমন— নিউক্লিয়ার বোমা।

চুল্লির তাপমাত্রা কমাতে বা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে ক্যাডমিয়াম পাইপ দিয়ে ইউরেনিয়াম রড ঢেকে দেয়া হয়। আর সম্পূর্ণ চুল্লির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করা হয় পানি। চুল্লির তাপে এ পানি বাষ্পে পরিণত হয়। এ বাষ্প দিয়েই টারবাইনের সাহায্যে জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। টারবাইনে ব্যবহারের পর এ বাষ্পকে কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে পানিতে পরিণত করে আবার চুল্লিতে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো কারণে চুল্লিটি বন্ধ করে দিলেও কয়েক দিন পর্যন্ত তার ভেতর উচ্চ তাপমাত্রা থাকে। কারণ পারমাণবিক বিক্রিয়া হঠাৎ করে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয়া যায় না। তাই চুল্লি বন্ধ করে দিলেও ডিজেল জেনারেটর অথবা ব্যাকআপ জেনারেটর দিয়ে পাম্প চালিয়ে রিয়েক্টরে পানিপ্রবাহ সচল রাখা হয়। এ পানিপ্রবাহ যদি কোনোভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে চুল্লির তাপমাত্রা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, ফলে ঘটতে পারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লি একই সঙ্গে প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও সুনামির আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিকল্প পাম্পগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চুল্লিতে পানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিস্ফোরণ ঘটে।

বিপর্যয়ের ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ডে পারমাণবিক কেন্দ্রে ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। চেরনোবিল দুর্ঘটনার কথা আমরা অনেকেই জানি। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনের চেরনোবিলে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু দেশটিরই ক্ষতি করেনি, এ ক্ষতি সারা বিশ্বের। ওই দিন চেরনোবিলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের চারটি চুল্লির একটি বিস্ফোরিত হয় এবং তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বেশকিছু অঞ্চলে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চেরনোবিল দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। শুধু বিদ্যুেকন্দ্রটি বন্ধ করতেই লাগে ৪০০ কোটি ডলার। এ দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন চেরনোবিলকে বহন করতে হবে হয়তো আরো অনেক বছর।

চেরনোবিলের পর মানবসভ্যতার ওপর আরো এক আঘাত আসে ২০১১ সালে, জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাধ্যমে। এর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বন্ধ অথবা ভবিষ্যতে নতুন করে আর স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পঞ্চাশের দশক থেকে ২০১০ পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কমপক্ষে ২৮টি পারমাণবিক কেন্দ্রে বড় মাপের দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতায় অগ্রসর দেশগুলোও এ দুর্ঘটনা এড়াতে পারেনি। জাপান ফুকুশিমা নিয়ে এখন পর্যন্ত সীমাহীন সংকটের মধ্যে রয়েছে। ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘টেপকো’ জানিয়েছে, ৩০০ টন তেজস্ক্রিয় পানি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র থেকে বেরিয়ে গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। জাপানের ঊর্ধ্বতন দুই হাজার বিজ্ঞানীর সংগঠন সায়েন্স কাউন্সিল অব জাপান এক গবেষণায় বলেছে, আগামী এক প্রজন্মেও ফুকুশিমা বসবাসযোগ্য হবে না। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস জানায়, ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পরে এটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে যে, পারমাণবিক কেন্দ্র আসলেই মারাত্মক রকমের বিপজ্জনক।

তেজস্ক্রিয়া

কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াও ইউরেনিয়াম মাইনিং, পরমাণু চুল্লি নির্মাণ, টাওয়ার শীতলীকরণ, পরমাণু বর্জ্যের পরিবহন ইত্যাদি বিষয় মিলিয়ে দেখলে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র বায়ুমণ্ডল, পরিবেশ ও প্রাণীর যে পরিমাণ ক্ষতি করে তা রীতিমতো ভীতিকর। জন উইলিয়াম ও ফিলিপ স্মিথ ২০০৪ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে কয়েক হাজার গুণ ক্ষতিকর সিএফসি অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরো কার্বন নিঃসরিত হয়, যাকে ‘মনট্রিল প্রটোকলে’ পরিবেশ দূষণের দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে তা সত্ত্বেও পরমাণু চুল্লি প্রতি বছর বায়ুমণ্ডলে ও পানিতে প্রায় এক মিলিয়ন কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়। এসব আইসোটোপের তালিকায় রয়েছে ক্রিপটন, জেনন, আর্গনের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাস; যা চর্বিতে দ্রবণীয়। পারমাণবিক কেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী কোনো মানুষ নিঃশ্বাস বা খাবারের সঙ্গে তা গ্রহণ করলে ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে তা দ্রবীভূত হতে পারে। তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো থেকে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে বংশানুক্রমিক রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। একইভাবে তা মানুষ ও প্রাণীর ডিএনএ মলিকিউলে ঢুকে পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় মাপের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

২০০৮ সালে জার্মান সরকার তাদের বাণিজ্যিক ১৬টি পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্রের দিকে যতই যাওয়া যায়, শিশুদের দেহে ক্যান্সার, বিশেষত লিউকেমিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকি তত বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ডিপার্টমেন্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরমাণুকেন্দ্রগুলোর আশপাশে স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার ১৯৫০-৫৪ থেকে ১৯৮৫-৮৬ সময়কালে বেড়েছে ৩৭ শতাংশ, যেখানে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তা বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।

বাংলাদেশে পারমাণবিক মরীচিকা

বাংলাদেশ সরকার পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করতে বদ্ধ পরিকর। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রোসাটম এ পারমাণবিক প্রকল্প নির্মাণের কাজ পরিচালনা করবে। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সরকারের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়, রূপপুরে দুটি পরমাণু শক্তিনির্ভর বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করা হবে। যার একেকটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১ হাজার মেগাওয়াট করে। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। বিনিয়োগের ৯০ ভাগ বহন করবে রাশিয়া আর ১০ ভাগ বাংলাদেশ। যদিও এ ব্যয় যে কয়েক গুণ বাড়বে তা পারমাণবিক বিদ্যুতের ইতিহাস থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এ বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য রূপপুরে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানি প্রকল্পের স্থাপনা নির্মাণের কাজ করছে।

Nuclear Power Project in Bangladesh

চলতি বছরের মে মাসে এ বিদ্যুেকন্দ্র পরিচালনায় কোম্পানি গঠনের জন্য ‘পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র আইন, ২০১৫’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে সরকার। সেসঙ্গে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি অব বাংলাদেশ’ নামে একটি কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের জানান, আইনে বিদ্যুেকন্দ্র পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র কোম্পানি গঠনের বিধান, কোম্পানি পরিচালনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভূমিকা এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশের (রাশিয়া) ভূমিকার বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে তৎকালীন আইয়ুব সরকারের সময়ে রূপপুরের একই স্থানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কথা ছিল। সে সময় চুল্লি শীতলীকরণের জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী নদী পদ্মার পানিকে। কিন্তু ভারত নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার ফলে এ পানির প্রবাহ কমে গেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। তখন প্রস্তাবিত বিদ্যুেকন্দ্র ছিল ৫০ মেগাওয়াটের। সেখানে এখন তা হয়েছে দুই হাজার মেগাওয়াট। নদীর পানি পাওয়া না গেলে ভূগর্ভের পানি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এতে কেবল ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাই কমবে না; বরং দূষিত তেজস্ক্রিয় পানি যদি ভূগর্ভের পানির সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে পুরো এলাকাতেই তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পড়বে।

বিশ্বের ৪৩৬টি রিঅ্যাক্টরের কোনোটিই মানবিক ভুলত্রুটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা বিপর্যয়ের ঊর্ধ্বে নয়। ফুকুশিমার দুর্ঘটনায় ওই শহরের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। চেরনোবিল দুর্ঘটনার পরও একইভাবে পুরো এলাকা খালি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত একটি দেশ, যেখানে রূপপুর ও তার নিকটবর্তী এলাকাগুলোয় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আবাস, যাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম কৃষি, সেখানে এমন দুর্ঘটনায় ওই এলাকা খালি করাটা প্রায় অসাধ্য। একইভাবে এ ঘনবসতি এলাকায় দ্রুত তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পড়াটাও খুবই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, নিজস্ব বিশেষজ্ঞ থাকার পরেও বিদ্যুৎ উৎপাদন মোট উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। অথচ পারমাণবিক কেন্দ্রে কোনো নিজস্ব বিশেষজ্ঞ না থাকার পরেও ভাড়া করা বিশেষজ্ঞ আর ধার প্রযুক্তি দিয়ে বিদ্যুতের মরীচিকা শেষ পর্যন্ত আমাদের যে ভালো কোনো ভবিষ্যৎ দেখাতে সক্ষম নয়, সেটি হলফ করে বলা যায়। পারমাণবিক বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়া সহনীয় পর্যায়ে আসতে প্রায় ১০ হাজার বছর সময় লাগে। তার মানে এ বর্জ্যকে ১০ হাজার বছর ধরে ঝুঁকিহীন অবস্থায় রাখতে হবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার বলা হয়েছে, পারমাণবিক বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে! কিন্তু এ বিষয়টি রাশিয়ার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। মূল চুক্তি সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ না করায় এ সম্ভাবনা আরো জোরালো হয়েছে।

পরমাণু বিদ্যুতের মরীচিকা থেকে রেহাই পেতে পরমাণু বিদ্যুতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সমাজের সব স্তরের মানুষকে অবগত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, রূপপুর আক্রান্ত হলে ঢাকা কত দূর! সেসঙ্গে দরকার বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের সুদৃঢ় প্রতিরোধ। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুতের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ তেজস্ক্রিয়ার ঝুঁকি কেবল আমাদের মাথার ওপরই থাকছে না, বরং পরবর্তী প্রজন্মগুলোকেও বয়ে যেতে হবে এ মরণ ঝুঁকি।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে এখানে: মরীচিকার নির্মম বাস্তবতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*