প্রকৃতিবিরোধী সমৃদ্ধিতে জীবন বাঁচে না

খলিলউল্লাহ্‌

২৩ জুন ২০১৭, ১১:১৯

প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু করতে গেলে তার ফল ভয়ানক হয়, সে কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে। বিশ্বজোড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঘটে চলা লাগামহীন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, জীববৈচিত্র্য ও ফসলহানি—এর সবই তার প্রমাণ। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে না করলে প্রকৃতি তার উল্টো ফল দেবেই। এর সত্যতা নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। কয়েক দিন আগে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা আমরা সবাই জানি। পাহাড়ধসের ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বনায়ন ধ্বংসের পরিণতিই এই পাহাড়ধস।


প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষ তার জীবনধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে না পারার কারণ এসব বিপর্যয়। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজাতি। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার নামে ধ্বংস করে চলেছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠতার মানে যে ধ্বংস নয়, বরং সংরক্ষণ—সেই বোধ মানুষের মনে জাগ্রত হচ্ছে না। এর ফলাফল আমরা পাচ্ছি অহর্নিশি।
প্রকৃতি ছাড়া মানুষ সুখী-স্বাস্থ্যবান হতে পারে না। মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য প্রকৃতির অবদানকে আমাদের সামাজিক অগ্রগতির মাপকাঠিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। যত দিন পর্যন্ত তা করা না হবে, তত দিন যতই আমরা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আর আলোচনা করি না কেন, তা কোনো কাজে আসবে না।
অনেক দিক থেকেই প্রকৃতি মানুষের জন্য মূল্যবান। খাদ্য, নির্মল বাতাস ও পানির মতো মৌলিক প্রয়োজন ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করে চলেছে এই প্রকৃতি। এ ছাড়া মানুষের নিজস্ব সত্তার উপলব্ধির জন্য প্রকৃতির রয়েছে মৌলিক অবদান। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের সুখানুভূতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রকৃতি। একবার ভাবুন তো! কোনো পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখছেন বা কোনো সুন্দর নদীর মনোরম বয়ে চলার দৃশ্য উপভোগ করছেন বা কোনো সবুজ উন্মুক্ত মাঠ পেরিয়ে চলেছেন? এ সবই মানুষের সুখী হওয়ায় অবদান রাখে, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার সুস্বাস্থ্যের জন্য অনস্বীকার্য।
প্রকৃতি থেকে এত কিছু পাওয়ার পরও আমাদের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের মাপকাঠি এতই সংকীর্ণ যে সেখানে প্রকৃতির জায়গা হয় না। শুধু দৃশ্যমান ও বস্তুগত দিক থেকেই আমরা সমৃদ্ধি পরিমাপ করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও মানুষের কল্যাণ পরিমাপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)। প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই পরিমাপে প্রকৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
তবে এর বিকল্প আছে। যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পদ সূচক বা ইনক্লুসিভ ওয়েলথ ইনডেক্স মানুষ ও প্রকৃতির বৃহত্তর পরিমাপ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ১৯৯২-২০১০ সময়কালে প্রথাগত জিডিপির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিকে অতিরঞ্জন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়নে আমরা দেখি জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক ও বহুমুখী দারিদ্র্য সূচকে অনেক বিষয়কে বিবেচনা করা হয়। বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এখনো প্রকৃতির ভূমিকাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না।
প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে এসব সূচক তৈরি করা হলে তার কিছু বিকৃত বৈপরীত্য দেখা যায়। যেমন পরিবেশ ধ্বংস করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। পরিবেশের এসব ক্ষতির আঁচ কিন্তু জিডিপির গায়ে লাগে না। একটি দেশ তার অতিপ্রয়োজনীয় বন কেটে উজাড় করে ধনী হয়ে যেতে পারে (অনেক দেশ সেটা করেও থাকে)। কিন্তু এর ফলে যে জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী ধ্বংস হলো তার হিসাব রাখা হয় না।
যুক্তরাজ্যের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস ফর পভার্টি এলেভিয়েশন (ইএসপিএ) এমন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বহুমুখী দারিদ্র্যের মাপকাঠি তৈরি করা। যখন প্রকৃতিতে মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে না, তখন মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হয়। জুডিথ স্লাইশার ও ভাস্কর ভিরা এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁরা মানব উন্নয়ন ও কল্যাণের মাপকাঠিতে প্রকৃতিকে বিবেচনার দাবি করেছেন। তাঁদের মতে বর্তমান স্থিতাবস্থায় গরিব মানুষের স্থান নেই। সমৃদ্ধির চলমান এসব সূচক ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী এলিটদের লাভ হয়, যারা পরিবেশ ধ্বংস করে মুনাফা অর্জন করতে পারে। আর ক্ষতি হয় সেসব গরিব মানুষের, যারা জীবিকার জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল এবং পরিবেশ ধ্বংসের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই দুই গবেষক আরও দাবি করেন, প্রকৃতিকে যতটুকু মূল্যায়ন করা হয়, তা পণ্য আকারে মুদ্রামানে রূপান্তরের মাধ্যমে। ফলে যারা সামর্থ্যবান, শুধু তারাই এর ফল ভোগ করতে পারে।
বোতলজাত পানি এমন একটি উদাহরণ। এখন বাতাসও বিক্রয়যোগ্য পণ্য। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে ব্যাপক হারে পরিবেশদূষণের শিকার হয়েছে চীনের রাজধানী বেইজিং। বাতাস এতটাই দূষিত হয়েছে যে সেখানে নিশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাস পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে লিও ডি ওয়াটস নামে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী বাতাস বিক্রি করে হাজার হাজার ডলার কামিয়েছেন। প্রতি বোতল বাতাসের দাম ধরা হয়েছে ১১৫ মার্কিন ডলার।
এ থেকেই বোঝা যায় যে প্রকৃতিকে অবহেলা করতে থাকলে এ রকম ভয়ানক ফল আরও বেশি ভোগ করতে হবে ভবিষ্যতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ নির্মাণে প্রকৃতির ভূমিকাকে অস্বীকার করা হবে বোকামি। প্রকৃতিকে অবহেলা করতে থাকলে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের বদলে তার ধ্বংসের পথেই আমরা এগিয়ে যাব। এর ফলে নিশ্বাসের বাতাস যেমন কিনতে হবে, তেমনি পাহাড়ধসে জীবননাশও ঠেকানো যাবে না।

খলিলউল্লাহ্‌: সহকারী সম্পাদক, প্রতিচিন্তা
khalil.jibon@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*