প্যারিস সম্মেলন: ইউরোপিয় ইউনিয়নের অবস্থান

জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর আধুনিক মানব সমাজ ধ্বংস করতে বসেছে তার আবাসভূমি, খোদ পৃথিবীটাই। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিখেনের মতো গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ পৃথিবীকে করে তুলেছে প্রচণ্ড উত্তপ্ত। মাসের হিসেবে ২০১৫ সালের প্রথম আট মাসের মধ্যে ছয়টিই গড়েছে উষ্ণতার নতুন রেকর্ড। ২০১৫ সাল হয়ে যেতে পারে স্মরণকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এভাবেই চলতে থাকলে অচিরেই খুব বড় ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে পৃথিবীবাসীকে।

প্রকৃতির রুদ্র রোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিবেশ বিষয়ক একটা বৈশ্বিক চুক্তি বা সমঝোতার তাগিদ বোধ করতে বাধ্য হয়েছেন বিশ্বনেতা-নীতিনির্ধারকরা। সেই লক্ষ্যেই আগামী নভেম্বরে প্যারিসে আসবেন ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধি। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিতে।

২০১৫ সালের এই আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ওপর প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের ভাগ্য। যারা আছেন প্রাণ হারাবার বা জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে। খুব দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় থাকবে না। ফলে আশা করা যায় যে, বিশ্বনেতাদের টনক কিছুটা হলেও নড়েছে।

Climate pledge Eu Position

নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্যারিস সম্মেলনের মাস দুয়েক আগে থেকেই প্রতিটা দেশ জাতিসংঘে জমা দিতে শুরু করেছে পরিবেশ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা। এবারের পর্বে ইউরোপিয় ইউনিয়ন:

১৮ সেপ্টেম্বর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় ইউরোপিয় ইউনিয়নের পরিবেশ বিষয়ক অবস্থান। ব্রাসেলসে ২৮টি দেশের পরিবেশ মন্ত্রীদের বৈঠকের পর একটি ঐক্যমত্য গঠন করেছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ)। প্যারিসে ইইউ-র অবস্থান হবে মোটামুটি এমন:

  • ২০৩০ সাল নাগাদ গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ১৯৯০ সালের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ কমানোর পূর্ব প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল থাকা। এবং এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সেটা শূণ্যতে নামিয়ে আনার জন্য বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানানো। শূণ্যতে নামিয়ে আনার মানে আর কোনো গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হবে না, এমন নয়। কিন্তু যে পরিমাণে নিঃসরণ হবে, সেই পরিমাণে অন্যান্য পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডও চালাতে হবে যেন দুইয়ের ভারসাম্য ঠিক থাকে।
  • দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডাকে সাড়া দিয়ে জলবায়ু তহবিলে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য উদ্যোগী হওয়ার অঙ্গীকার। এই তহবিলে অর্থ প্রদানের বিষয়টি শুরু হবে ২০২০ সাল থেকে। প্রতিশ্রুতিটি করা হয়েছিল ২০০৯ সালে।
  • পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি দেশ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা চুক্তির আইন অনুযায়ী কাজ করছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য পঞ্চবার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান। প্রতিটা দেশের সরকার তাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখছে কিনা, তা নজরে রাখার জন্য কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে কথা বলা হবে। ইইউ মনে করে এতে পুরো ব্যাপারটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক হবে।

২০১০ সালের কানকুন সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, শিল্প বিপ্লবের আগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা কোনোভাবেই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি হতে দেওয়া যাবে না। গত আগস্ট মাসে এটি ছিল ০.৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রধান ক্রিস্টিনা ফিগারিজ ব্রাসেলসে সবাইকে সতর্ক করেছেন যে, যেভাবে সবাই গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের পরিকল্পনা দিচ্ছে, সেভাবে চলতে থাকলে তাপমাত্রা বাড়বে তিন ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত। আর বিশ্ব এই ভয়ঙ্কর বিপদসঙ্কুল পথেই যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।

পরিবেশবাদীদের সন্দেহ:

ইইউ-র পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন পরিবেশবাদীরা। ডব্লিউডব্লিউএফ ইউরোপিয়ান পলিসি অফিসের প্রধান গেনেভিভে পোন্স ডেলাড্রেরে বলেছেন, ‘এটা খুবই আফসোসের বিষয় যে ইউরোপিয়ান মন্ত্রীরা এটা বলতে পারলেন না যে কিভাবে ইইউ তাদের পরিবেশ ও জ্বালানী বিষয়ক লক্ষ্যগুলো আরও প্রসারিত করতে চায়।’

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীনপিস-এর ইউরোপ শাখার জ্বালানী নীতি বিষয়ক পরামর্শক জিরি জেরাবেক বলেছেন, ‘কিভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানি অধ্যায় পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া যায়, তেমন একটা দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য প্যারিসে একজোট হয়ে কাজ করা উচিৎ ইউরোপের।’ ব্রাসেলসে ইইউ-র মন্ত্রীদের বৈঠক চলার সময় বাইরে একটা প্রতিবাদ কর্মসূচীও পালন করেছে গ্রীনপিস। তাদের মতে, ইউরোপ পরিবেশ রক্ষায় খুব বেশি উদ্যোগী হচ্ছে না।

ইইউ-র বক্তব্য:

ইইউ-র পরিবেশবিষয়ক কমিশনার মিগুয়েল আরিয়াস কানেতে অবশ্য বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘শুধুই নির্ধারিত নীতি মেনে নেওয়ার ভূমিকায় না; পরিবেশ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে প্যারিসে ইইউ থাকবে নীর্তি প্রস্তুতকারকের ভূমিকায়।’ এবারের সম্মেলনে ইউরোপিয় ইউনিয়ন একটি আইনগত চুক্তিপত্র প্রণয়নের জন্য জোর তৎপরতা চালাবে। যেটা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে ইইউ। কানেতে বলেছেন, ‘আমরা একটা বিশদ উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিবেশ চুক্তি প্রণয়ণের পক্ষে শক্তভাবে দাঁড়াব। এর চেয়ে কম কোনো কিছুই আমরা মেনে নেব না।’

২০২০ সালের পর গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে একটা চুক্তির আশা করা হচ্ছে এবারের প্যারিস সম্মেলনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*