প্যারিস সম্মেলন: যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

প্রকৃতির রুদ্র রোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিবেশ বিষয়ক একটা বৈশ্বিক চুক্তি বা সমঝোতার তাগিদ বোধ করতে বাধ্য হয়েছেন বিশ্বনেতা-নীতিনির্ধারকরা। সেই লক্ষ্যেই আগামী নভেম্বরে প্যারিসে আসবেন ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধি। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিতে। ২০১৫ সালের এই আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ওপর প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের ভাগ্য। যারা আছেন প্রাণ হারাবার বা জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে। খুব দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় থাকবে না। নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্যারিস সম্মেলনের মাস দুয়েক আগে থেকেই প্রতিটা দেশ জাতিসংঘে জমা দিতে শুরু করেছে পরিবেশ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা।

Climate pledge United States Position

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দুইটি দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। জলবায়ু বিষয়ে একটি বৈশ্বিক আইনি চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই দুই দেশের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্যমত্য না হওয়াতে জলবায়ু বিষয়ে কার্যকরী কোনো অবস্থান গ্রহণ করা যায়নি বিগত সম্মেলনগুলো। তাই এবার প্যারিস সম্মেলনের আগ দিয়ে পুরো বিশ্বের নজর ছিল এই দুই দেশের দিকে। জাতিসঙ্ঘের ২১তম শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলনের আগে একটা যৌথ রূপকল্প হাজির করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এবারের পর্বে থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা:

২০০৫ সালের সাপেক্ষে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন ২৬-২৮ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে ২০৩০ সাল নাগাদ।

এজন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রণয়ন করেছে ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান। যার মাধ্যমে পাওয়ার প্ল্যান্ট মালিকদের র্নিদেশ দেওয়া হয়েছে, ২০০৫ সালের সাপেক্ষে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনার জন্য।

ওবামা প্রশাসনের এই অবস্থান নিয়ে তুমুল সমালোচনা করছে রিপাবলিকানরা। এমনকি আমেরিকান কোয়ালিশন ফর ক্লিন কোল ইলেকট্রিসিটি নামের একটি লবি গ্রুপ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। এত ডামাডোলের মধ্যেও ওবামা যে এই অবস্থান চূড়ান্ত করেছেন সেজন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে অনেকে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর কার্বন নির্গমনের ওপর প্রথমবারের মতো সীমারেখা নির্ধারণের বিষয়টি প্যারিস সম্মেলন সফল হওয়ার পথে বড় অবদান রাখবে।

কিন্তু পরিবেশবাদীরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে আরও বেশি অবদান রাখা উচিৎ ছিল বলে মত দিয়েছেন অনেকে। নিউ ক্লাইমেট ইন্সটিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জলবায়ুনীতি বিশ্লেষক নিকলাস হোনে বলেছেন, “এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানী খাতে যা হচ্ছিল, তার তুলনায় এটা অবশ্যই একধাপ পরিবর্তন। কিন্তু নেতিবাচক ব্যাপার হলো: জলবায়ু বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের যে আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা আছে তার পূরণে এটা যথেষ্ট নয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে মাঝারি মানের বলে রায় দিয়েছে ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার। হোনে বলেছেন, “যদি সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মতো কর্মপদ্ধতি বানায়, তাহলে আমরা যেতে থাকব ৩-৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধির দিকে।”

১৯৯০ সালের সাপেক্ষে হিসেব করলে (যেমনটা ইউরোপিয় ইউনিয়ন করেছে) ২০৩০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র কমাবে মাত্র ১৩ শতাংশ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন। ইউ কমাতে চেয়েছ ৪০ শতাংশ। ফরাসি জ্বালানী বিশেষজ্ঞ পিরে রাদানে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এই মাত্রায় থাকতে পারে না। এটা কোনো যথার্থ নেতৃত্ব নয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*