যে বিষয়গুলোতে ঐক্যমত্য চাই প্যারিস সম্মেলনে

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে থাকা বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে আলাপ-আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন বিশ্বনেতারা। ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের এই শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলনকে বিবেচনা করা হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার অন্তিম সময় হিসেবে। এবার যদি পরিবেশ বিষয়ে একটা বৈশ্বিক আইনি চুক্তি না করা যায়, তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিগত তিন দশক ধরে নানামুখী আলাপ-আলোচনায় অনেক কিছু জমা হয়েছে এজেন্ডা হিসেবে। তবে এবার প্যারিসে মূল কিছু বিষয়ে অবশ্যই ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে হবে বিশ্বনেতাদের।

Time to Take Action at Paris Climate Conference

গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস

পুরো বিশ্ব একমত হয়েছে যে, গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমাতে হবে। যেগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে পৃথিবীকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই নির্গমন কি হারে কমানো হবে?

জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রাক শিল্পায়ন যুগের সাপেক্ষে বৈশ্বিক উষ্ণতা কোনোভাবেই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের ওপরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তবে বিশ্বের গরীব ও নিচু স্থানে থাকা ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো (যারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম ও প্রবল শিকার হবে) বলেছে, দুই ডিগ্রীও যথেষ্ট না। যেতে হবে ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কঠিন লক্ষ্যে। উষ্ণতা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত গেলেও পৃথিবীতে অনেক খরা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসতে পারে। তবুও জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা এটাকে তুলনামূলকভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো বলে বিবেচনা করছেন।

সময়টাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধিকেই লক্ষ্য বানালে, ২০২৫ সাল নাগাদ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন সর্বোচ্চ অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এরপর বেশ দ্রুতগতিতে কমানো শুরু করতে হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ পরিবেশে আর কোনো কার্বন ডাই অক্সাইড যোগ করা যাবে না।

নায্যতা

১৯৯২ সালে ইউএনএফিসিস সনদে বলা হয়েছিল বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোই ঐতিহাসিকভাবে পরিবেশের ক্ষতি করেছে। আর এই সমস্যা সমাধানের জন্য তাদেরই বেশি পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ। ১৯৯৭ সালে প্রণয়ন করা কিয়োটো প্রটোকলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছিল। ২০০৫ সাল থেকে কার্যকরী হওয়া কিয়োটো প্রটোকলে বলা হয়েছিল শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোই নির্গমনের মাত্রা কমাবে। সেসময়ের শীর্ষ নির্গমনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এতে সাক্ষর করেনি।

তারপর অবশ্য অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়েছে। বিগত ২৫ বছরে দ্রুত উন্নয়নশীল চীন ও ভারত পরিণত হয়েছে প্রথম ও চতুর্থ সর্বোচ্চ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশে। যাদেরকে একসময় উন্নয়নশীল দেশ বলে বিবেচতা করা হতো, তাদের অনেকেই এখন অর্থনৈতিকভাবে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে চলে গেছে। একই সময়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র কার্বন নির্গমন করেই গেছে।

এখন এই পরিবর্তিত বিশ্বে কিভাবে নির্গমনের মাত্রা নির্ধারণ করা যাবে, তা নিয়ে চলছে আলাপ-আলোচনা। কিয়োটো প্রটোকলে লেখা হয়েছিল দেশগুলোকে ‘পৃথকীকৃত দায়িত্ব’ পালন করতে হবে। এই নীতিটা বাদ দেওয়া হবে নাকি অনেক পরিমানে সংশোধিত করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে কিভাবে নির্গমনের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে, যাচাইয়ের নিয়ম বানানো হবে ও কিভাবে অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা যাবে।

অর্থ

২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ঐক্যমত্য গঠন হয়েছিল একটি ক্ষেত্রে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২০ সাল থেকে গরীব দেশগুলোকে বাৎসরিকভাবে ১০০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছিল ধনী দেশগুলো।

এই অর্থের একাংশ ব্যয় হওয়ার কথা গরীব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর নতুন প্রযুক্তি গড়ে তোলার পেছনে। যেন তারাও গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে। আর বাকিটা ব্যয় করা হবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চরম ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর পেছনে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু এই অর্থ কিভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং সেটা কিভাবে বন্টন করা হবে তা নির্ধারণ করা এখনও বাকি আছে।

সম্প্রতি অনুন্নত, উন্নয়নশীল ও ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নামে আরও বাড়তি একটি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে। সে ব্যাপারে এখনও কিছু জানানো হয়নি ধনী দেশগুলোর তরফ থেকে।

পর্যালোচনা

প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু বিষয় একটা বৈশ্বিক আইনি চুক্তির ভিত্তি হবে প্রতিটি দেশের জাতীয় কর্মপরিকল্পনাগুলো। যেগুলোকে বলা হচ্ছে ‘ইন্টেনডেট ন্যাশনালি ডিটারমাইনড কন্ট্রিবিউশন (আইএনডিসি)।’ ইতিমধ্যে শীর্ষ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলো (চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, ভারত, রাশিয়া, জাপান) তাদের কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে জাতিসংঘে। কিন্তু বিজ্ঞানী-বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখা যাবে না। এই শতাব্দী শেষে সেটি দাঁড়াবে ২.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসে।

ফলে কিছু দেশ খুব কঠোরভাবে একটা পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব করেছেন। যার কার্যক্রম শুরু হবে ২০২ সাল থেকে। এবং দেখা হবে যে দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রার রাস্তায় দুনিয়া চলছে কিনা। যদি না চলে তাহলে কিভাবে দেশগুলো আরও বেশি অবদান রাখতে পারে তাও তখন নির্ধারণ করা হবে।

Climate Action: The choice is our’s

Climate Action: The choice is our’s

নভেম্বরের ৩০ থেকে ডিসেম্বরের ১১ তারিখ পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক ২১তম শীর্ষ সম্মেলন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*